সোমবার, ১৩ Jul ২০২০, ১০:৪০ অপরাহ্ন২৯শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট মোদির জন্য বুমেরাং হয়ে উঠছে

সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট মোদির জন্য বুমেরাং হয়ে উঠছে

কাজী নুসরাত শরমীনঃ পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের অমুসলিম অভিবাসীদের নাগরিকত্বের সুযোগ দিয়ে জাতিগত বিভাজন সৃষ্টিকারী এই আইনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ভারতের ছাত্র শিক্ষক বুদ্ধিজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ। বিতর্কিত এই আইনের কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণে পরিচয় হারানোর দুশ্চিন্তায় পড়েছে দেশটিতে কয়েক পুরুষ ধরে বসবাস করা কোটি কোটি মানুষ। যে রাষ্ট্রকে তারা জন্মভূমি বলে জেনেছে জন্মাবধি, সেই রাষ্ট্রে আজ তাকে অনাগরিকের লাইনে দাঁড়িয়ে নথিপত্র হাতে আবেদন করে প্রমাণ করতে হবে নিজেকে।জমা দেওয়া নথি বিজেপি সরকারের কাছে যুৎসই মনে হলেই কেবল তিনি নারিকত্বের সার্টিফিকেট পাবেন, আর তা না হলেই তিনি অবৈধ অভিবাসী !

যারা কয়েক পুরুষ ধরে ভারতে বাস করে. রেশন কাড, পড়াশুনা, চাকরি করেছেন, ভোটও দিয়েছেন নাগরিক হিসেবে, এটা তাদের জন্য প্রহসন ছাড়া আর কি? এতকিছুর পরেও কিন্তু নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি না থাকলে এই সবই কলের গান। যারা এই প্রহসনের নিক্তিতে অবৈধ প্রমাণিত হবেন, তাদেরকে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে আবেদন করতে হবে।

যদিও অমিত শাহ বলেছেন, নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনের ফলে ভারতে বাস করা “লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি” মানুষ উপকৃত হবেন। কিন্তু ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, সুবিধা পাবেন গোটা দেশে মাত্র ৩১,৩১৩ জন। ২৫,৪৪৭ জন হিন্দু, ৫,৮০৭ জন শিখ, খ্রিস্টান ৫৫ জন, ২ জন বৌদ্ধ, ২ জন পার্সি। এই আইনের অথ হচ্ছে, মাত্র এই ৩১,৩১৩ জন মানুষ কে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য দেশটির ১৩২ কোটি মানুষ কে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া ! একটি দেশের আপামর জনতা যখন কোনো বিতর্কিত বিষয়ের বিরুদ্ধে একাট্টা হন, সে আন্দোলন দানা বাঁধতে সময় লাগে না। সর্বস্তরের মানুষের বঞ্চনার এই জনরোষ মোদি সরকারকে কতটা টালমাটাল করে দেয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। নতুন নাগরিক আইনের ঘোর বিরোধী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজপথে আছেন চতুর্থ দিনের মতো।স্লোগান একটাই, ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নতুন নাগরিকত্ব আইন কার্যকর করতে দেব না’- সিএবি সংসদে পাস হওয়ার পর থেকে চলছে টানা বিক্ষোভ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম নির্বিশেষে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে শামিল হয়েছেে এই কালো আইনটির বিরুদ্ধে। দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বর হামলা চালিয়েছে পুলিশ। এই ‍দিন প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়। এদের মধ্যে ৩৫ জনকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মুগ্ধ হয়েছি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নাজমা আখতার ‘র বলিষ্ঠ ভূমিকায়। বিনা অনুমতিতে ক্যাম্পাসে ঢুকে পুলিশি হামলার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।এ ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এর পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার কথা জানিয়েছেন গণমাধ্যমকে।

হাজার হাজার মানুষ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে দিল্লি থেকে হায়দ্রাবাদ, মহারাষ্ট্র থেকে কর্নাটক-সর্বত্র রাস্তায় নেমে বিক্ষোভে শামিল হয়েছেন। এ বিক্ষোভে অংশ নিতে গিয়ে আটক হয়েছেন ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাত-সহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তি। বুধবার রাত থেকেই ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করেছিল প্রশাসন। চারজনের বেশি লোকের জমায়েতের ওপর জারি করা হয়েছিল নিষেধাজ্ঞা। তবে সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে রাজ্যে রাজ্যে সম্মিলিত বিক্ষোভের সাক্ষী থাকল গোটা ভারত। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল দেশটির উত্তর থেকে দক্ষিণ। আগুনে পোড়ানো হল বাস। ভাঙচুর চালানো হল পুলিশের গাড়িতে। দিল্লির লালকেল্লা, মান্ডি হাউসের পাশাপাশি বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদেও চলছে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। বলা হচ্ছে বিক্ষোভের কারণেই অমিত শাহ্ তার গুজরাট সফর বাতিল করেছে! এরই মধ্যে সরকারি নির্দেশে দিল্লির কয়েকটি জায়গায় মোবাইল ইন্টারনেট, ভয়েস কল ও এসএমএস পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

১৯৭৫ সালের ২৫ জুন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে ভারতজুড়ে জরুরী অবস্থা জারি হয়। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯ মাস ধরে চলা এই জরুরি অবস্থাকে ভারতের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসাবে ব্যাখ্যা করেন রাজনীতিবিদের একাংশ, বিতর্কিত আইন নিয়ে ভারতের এই উত্তাল পরিস্থিতিতে বর্তমান জরুরি অবস্থার সাথে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে চলা ১৯ মাস জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে টুইট করেছেন।মুখ্যমন্ত্রী মমতাও কম যান না, তিনি মোদির শাসনকালের এই অচলাবস্থাকে ‘সুপার ইমার্জেন্সি’ হিসেবে কটাক্ষ করেন।

পরিচিতি: লেখক, সাংবাদিক

 

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  





themesba-zoom1715152249
©জাগো বাংলা.নিউজ কর্তৃক সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত।
Developed By: Nagorik IT